একজন সবজি চাষীর সংগে কিছুক্ষন

গতকাল ছিল জানুয়ারি মাসের প্রথম শুক্রবার। বিকেলবেলা ব্র্যাক কৃষি গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রের ফার্মের দিকে রওনা হলাম শীতের বিকেলটাকে সুন্দরভাবে উপভোগ করতে। একটু আগেভাগেই গেলাম। পড়ন- বিকেলের মিষ্টি আলোয় পালংশাকের ছবি তুলব আর আমাদের স্টাফরা ব্যাডমিন্টনের যে নতুন কোর্ট কেটেছে, সেখানে অনেকদিন পর একটু ব্যাডমিন্টন খেলব। ক্যামেরায় ছবি তুলে এবং ব্যাডমিন্টন খেলা শেষ করে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরছিলাম। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষিত এলাকার প্রাচীরের প্রান- অতিক্রম করছি, এমন সময় আবছা অন্ধকারে বরাবরের মতো একটু পরিচিত গলায় শুনতে পেলাম, ‘দাদা, কেমন আছেন?’ কাছে আসতেই বুঝলাম, এ হল ইয়াসিন! এলাকার একজন সবজিচাষী। আগে আমাদের ফার্মেই কাজ করত। এখন নিজেই তার বসতবাটিসংলগ্ন প্রায় বিঘাখানেক জমিতে বিভিন্ন রকমের সবজি চাষ করে। তাতে যে আয় হয় তা দিয়েই তার সংসার ও দুই ছেলের লেখাপড়ার খরচ চলে।

ফার্মে যাওয়া-আসার পথে ইয়াসিনের সঙ্গে প্রায়ই দেখা হয়। কখনও দেখি বড় আকৃতির ঝুড়িতে করে বিভিন্ন রকমের সবজি মাথায় নিয়ে হন্‌হন্‌ করে ছুটছে বাজারের উদ্দেশে, কখনও দেখি পথিমধ্যে চায়ের দোকানে বসে খরিদ্দারদের সঙ্গে সবজি বেচার ব্যাপারে দর কষাকষি করছে। আবার কখনও দেখি বাজারে সবজি বিক্রি শেষে শুন্য ঝুড়িটা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরছে। সব সবজি বিক্রি হয়ে গেছে, তাই চিত্ত তার প্রসন্ন।

গতকাল সন্ধ্যায় দেখা হলে কুশল জিজ্ঞাসার পর ইয়াসিন আমার কাছে প্রথমেই জানতে চাইল যে, এখন কী কী সবজিচাষ করা যায়! ওকে লালপালং, সবুজপালং, বাটিশাক, ফিলিপাইন সরিষাশাক আর মিষ্টিকুমড়ার চাষ করার পরামর্শ দিলাম। সবুজপালং আর মিষ্টিকুমড়া  ছাড়া ওর কাছে বাকি তিনটি শাকই নতুন। বললাম, ‘এ শাকগুলোর এখনও মৌসুম রয়েছে, এগুলো চাষ করতে পার। এসব শাক খুব তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠে, খেতেও সুস্বাদু আর পুষ্টিমানও যথেষ্ট।’

পরদিন ইয়াসিন আমাদের ফার্মে চলে এল। বললাম, ‘আমি তোমাকে সবজিগুলোর অল্প কিছু করে বীজ দিয়ে দিচ্ছি। ইয়াসিন আমাদের নতুন উদ্ভাবিত পাটশাকের বিকল্প ‘প্রিন্সশাক’-এর মৌসুম এবং চাষবাস সম্পর্কে জানতে চাইল। বললাম, ‘প্রিন্সশাকের মৌসুম শুরু হবে শীত চলে গেলে আর চলবে আগামী বছর শীত আসার আগ পর্যন-।’ শীতকালীন সবজির চাষ সম্পর্কে জানতে চাইলে বললাম, ‘তুমি ধনেপাতার চাষ কর কি না?’ উত্তরে ইয়াসিন বলল, ‘একবার বীজ বুনেছিলাম। ধনেশাক ওঠাতে দুই মাস লেগে গিয়েছিল। ওই সময়ে লালশাক, সরিষাশাক, মুলাশাক দুবার করা যায়।’ আমিও সবজিচাষের ঠিক এদিকটার উপর গুরুত্ব দিয়ে আমার গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

ছোটখাট সবজিচাষীদের হাতে পুঁজি কম। তারা এমন সব সবজিচাষ করতে চায়, যা অল্পদিনের মধ্যেই বাজারে বিক্রি করে দুপয়সা আয় করে সংসারের খরচ চালাতে পারে। এই উদ্দেশ্যেই বর্তমানে আমরা ব্র্যাক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের সবজি বিভাগে পালংশাক, ধনেশাক, বাটিশাক, ফিলিপাইন সরিষাশাক, কলমিশাক, প্রিন্সশাক এগুলো আবাদের উপর জোর দিয়েছি। এগুলো সবই স্বল্পমেয়াদি শাক। বীজ বোনার পর এক মাস বা দেড় মাসের মধ্যে এগুলো বাজারে বিক্রির উপযোগী হয়। এসব শাকে নানারকমের ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ ছাড়াও ফাইবার ও আ্যন্টি অক্সিড্যান্ট আছে। এসব উপাদান আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এই শাকগুলোর বেশির ভাগই একবার বুনে দু-তিনবার কেটে কেটে শাক সংগ্রহ করা যায়। আবার বর্ষা মৌসুমে পলিথিন টানেল তৈরি করে ‘অফ সিজন ভেজিটেবল‘ হিসেবে এগুলোর চাষ করে প্রচুর মুনাফা করা সম্ভব।

আজকাল ত্বকের উজ্জ্বলতা, স্মৃতি ও দৃষ্টিশক্তি বাড়ানোর জন্য, দাঁত, হাড়গোড়  ইত্যাদি শক্ত করার জন্য, চুলপড়া ও খুসকি রোধ করার জন্য, ইউরিনারি ট্র্যাক্টের সমস্যা প্রতিরোধের জন্য, ডায়াবেটিস-হৃদরোগ ইত্যাদি থেকে শরীরকে মুক্ত রাখার জন্য, এমনকি ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধি প্রতিরোধের জন্য নানা রকমের ও নানাবর্ণের সবজিজাতীয় খাবারের উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আজকাল প্রতিদিনের খাবারের তালিকা এমনভাবে সাজানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যাতে ফল ও সবজির সমাহারে সেখানে রঙধনুর মতো সাতরঙের সমাবেশ ঘটে।


প্রকৃত পক্ষে আমাদের প্রত্যেকেরই প্রতিদিন কিছু না কিছু বিভিন্ন বর্ণের সবজি খাওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, শুধু সবুজ শাকসবজিতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান পাওয়া যায় না। খাদ্যতালিকায় নানা বর্ণের সবজি রাখার গুরুত্ব তাই এত বেশি।

ইয়াসিনের সঙ্গে কথায় কথায় লাউয়ের প্রসঙ্গ এল। ইয়াসিন বলল, বসনে-র শেষাশেষি ও গ্রীষ্মের শুরুতে লাউ লাগিয়ে লাউডগা বিক্রি করেই যথেষ্ট আয় করা সম্ভব। তবে ভালো ডগা উৎপাদনকারী জাত চাষ করতে হবে। ইয়াসিন আরও বরল, মিষ্টিকুমড়ার চেয়ে মিষ্টিকুমড়ার ডগা বিক্রি করে বেশি উপার্জন করা যায়। তার মতে, যদি ভালো জাতের ডগা উৎপাদনকারী কুমড়া লাগানো যায় এবং প্রয়োজনীয় চাষবাসের কৌশল প্রয়োগ করা যায়, তাহলে মিষ্টিকুমড়ার চেয়ে তার ডগা বিক্রিই বেশি লাভজনক। মুলাপ্রসঙ্গে ইয়াসিন বলল, এখন বাজারে লালমুলার বেশ কদর। তাই লালমুলা বিক্রির পাশাপাশি সে বীজ উৎপাদনের জন্য ঐ মুলার কয়েকটা ভালো গাছ রেখে বীজ উৎপাদন করবে। ঐ বীজ দিয়ে আগামী বছর লালমুলা চাষ করবে। অর্থাৎ বেশি পয়সা দিয়ে বীজ না কিনে নিজের উৎপাদিত মুলাবীজ দিয়েই সে মুলা চাষ করতে চায়।

আমরা সচরাচর মরিচের চারা তৈরি করে তা জমিতে লাগাই। কিন-ু ইয়াসিনের যুক্তি হল তাতে গাছে মরিচ ধরতে বেশি সময় লাগে। বরং, ভাল জাতের মরিচের বীজ বুনে ঠিকমতো পরিচর্যা করলে স্বল্প সময়ে প্রচুর ভালো মানের মরিচ উৎপাদন করা যায়। এরপর বরবটির কথা উঠল। ইয়াসিনের মতে ঠান্ডা একটু কমে এলে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে বরবটি চাষ করা ভাল। তবে জাব পোকার উৎপাত নিয়ে সে বেশ বিরক্ত। টমেটো গাছে খুঁটি দেওয়া না দেওয়া নিয়ে আমার মতামত জানতে চাইল। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, চাষের খরচ কমাতে চাইলে খুঁটি না দিলেও চলে, তবে খুঁটি দিলে বেশি ফল ধরে আর টমেটোও মানসম্পন্ন ও বড় বড় সাইজের হয়। ধৈঞ্চার গাছ থাকলে গাছে খুঁটি দেওয়ার জন্য ঐ গাছের কাঠি ব্যবহার করা যায়। তাতে খুঁটির জন্য বাড়তি পয়সা খরচ করতে হয় না। খুঁটি যে একটু তেরচা করে দিতে হবে এমন নয়; সোজা করে খুঁটি পুঁতে তার সঙ্গে গাছ বেঁধে দিলেই হবে। গোড়ার দিকে পুরনো পাতা আর দুর্বল কুশি ভাঙার পরামর্শও দিলাম। বেগুনের ক্ষেত্রে ইয়াসিনের পছন্দ বড় সাইজের গোলাকৃতি বেগুন। বেশি দাম দিয়ে চারা কিনেও ওই বেগুন চাষে ইয়াসিন বেশ আগ্রহী। 

প্রায় আধঘণ্টা যাবৎ ইয়াসিনের সঙ্গে আমার আলাপ হল। সবজিচাষের ব্যাপারে ইয়াসিনের অভিজ্ঞতা আর অভিমত শুনছিলাম আর লক্ষ করছিলাম এই স্বল্পশিক্ষিত লোকটির চোখেমুখে চাষাবাদবিষয়ে গভীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অভিব্যক্তি। আসলে ইয়াসিনের চোখেমুখে আমি সেদিন এক অভিনব দীপ্তি দেখেছিলাম। সবজি আবাদে নানারকম সুবিধার পাশাপাশি অসুবিধার কথাও সে জানাল। বলল, টমেটো, বেগুন এই সবজিগুলোতে চার-পাঁচদিন পর পর সেচ দিলেও চলে, কিন-ু শাকচাষে ঘনঘন সেচ দিতে হয়। প্রতিদিন অন-তপক্ষে একবেলা, কখনও কখনও দুইবেলা পানি দিতে হয়। এজন্য ওর কষ্টও হয় বেশ। কেননা পানি আনতে হয় বেশ খানিকটা দূর থেকে। কলস ভরে পানি বইতে বইতে ওর কোমর ব্যথা হয়ে যায়। স্কুলে-পড়া তর দুই ছেলে পড়াশোনায় ব্যস- থাকে। তাই বাবার কাজে তেমন একটা সহযোগিতা করতে পারে না।

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ইয়াসিনের মতো অনেক সবজিচাষী পাওয়া যাবে যাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে গ্রামীণ অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে এবং পুষ্টির অভাব দূর করার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হবে। আমাদের চাষীদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা বিকশিত করার যথাযথ ও কার্যকর ব্যবস'া নিলে আমাদের দেশকে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে দেওয়া যায়।
 

ড. সীতেশচন্দ্র বিশ্বাস
সিনিয়র সেক্টর স্পেশালিস্ট (সবজি গবেষণা)
ব্র্যাক কৃষি গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র
জয়দেবপুর, গাজিপুর


আমাদের কর্মস্থল

                

ব্র্যাক কুইজ

কোনটি দারিদ্র্য দূরীকরনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী?

বিকল্প যোগাযোগ পন্থা