আলেয়ার আখ্যান

শুরুর দিনগুলো ও তারপর
 
১৯৫২ সালের ২ এপ্রিল অধুনা নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানার কুশিয়ারা গ্রামে আলেয়া বেগমের জন্ম। দুই ভাইবোনের মধ্যে তিনিই বড়। মাত্র তের বছর বয়সে বিয়ে হল তার। তখন কেবল ষষ্ঠ শ্রেণি পাশ করেছেন। বিয়ের পরও আলেয়া লেখাপড়া ছাড়লেন না। ১৯৬৮ সালে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার নবীগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করলেন। ১৯৬৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের নার্সিং ইন্সটিটিউটে ভর্তি হলেন। ৪ বছরের কোর্স শেষ হল ১৯৭৩ সালে। নার্সিং পড়ার পাশাপাশি ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজ থেকে রেগুলার প্রাইভেট হিসেবে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েও কৃতকার্য হলেন।

১৯৭৫ সালে আলেয়া সংসার শুরু করলেন। সোনালী ব্যাংকের ‘অ্যাকাউন্টস ক্লার্ক’ পদে চাকরিও হল তার। চাকরি করলেন ১৯৮০ সাল পর্যন-। তবে ১৯৭৯ সাল থেকে স'ানীয় এক সমবায় সমিতির সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়ে নারীদের সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। ঐ সমবায় থেকেই সেলাই এবং বাঁশবেতের কাজ শিখলেন। নার্সিংবিদ্যা জানা থাকায় প্রাথমিক স্বাস'্যসেবা তো বরাবরই দিয়েছেন। ১৯৮০ সালে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে  চাকরি নিলেন। স্কুলে থাকলেন ১৯৮৭ সাল পর্যন-। ১৯৯৭ সালে ব্র্যাকের শিক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হলেন। নিজ বাড়িতেই ব্র্যাকের স্কুল  চালু করার জন্য ঘরের ব্যবস'া করলেন। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের মায়েদেরকে নিয়ে ১৯৯৯ সালে গঠন করলেন গ্রামসংগঠন এবং তিনি মনোনীত হলেন সংগঠনের সভানেত্রী। 
 

আইনের অঙ্গনে
 
১৯৯৯ সালের শেষ দিকে আলেয়া বেগম সাভার টার্কে এসে ব্র্যাকের মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কর্মসূচি থেকে ‘এইচআরএলই সেবিকা’র প্রশিক্ষণ নিলেন। এরপর এলাকায় ফিরে গিয়ে তের-চোদ্দটি ক্লাস করালেন।

২০০৩ সালে ব্র্যাকের ‘আইন সহায়তা কর্মী’ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলেন। এবারও সাভার টার্ক। মোট ১৪ দিনের প্রশিক্ষণ। এর মধ্যে ১১ দিন মানবাধিকারবিষয়ক আর বাকি ৩ দিন ভূমি পরিমাপবিষয়ক প্রশিক্ষণ। এ প্রশিক্ষণ লাভ করে তিনি বাল্যবিয়ে বন্ধ, নারী নির্যাতন বন্ধে সালিশমীমাংসা, দাম্পত্য জীবনে ঝগড়াবিবাদ, পারিবারিক টানাপোড়েন ও বিবাহবিচ্ছেদ দূর করাসহ নানা কাজে ভূমিকা রেখেছেন। নারীশিক্ষার প্রসারেও কাজ করছেন। ব্র্যাক ওয়াশ কর্মসূচির পয়নিষ্কাশন কাজেও যুক্ত রয়েছেন।

অতঃপর জনপ্রতিনিধি


এসব কাজের মধ্য দিয়ে আলেয়া বেগম সামাজিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে হয়ে ওঠেন। এরই ফলস্বরূপ ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলা নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
এলাকায় আলেয়া বেগম অত্যন- জনপ্রিয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে তিনি এরই মধ্যে তাঁর নিজস্ব ভাবমূর্তি নির্মাণ করতে পেরেছেন। কাজ করতে গিয়ে কোন সমস্যা হয় কি না জিজ্ঞেস করাতে বললেন, ‘কিছুদিন আগে এলাকায় এক শিশুকন্যাকে ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদ করে বেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিলাম। হুমকি পাওয়ার পরও আমি পিছিয়ে আসি নি। সম্প্রতি আমাদের এলাকার নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে তার বাবা-মা জোরপূর্বক প্রবাসী পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দিতে চাইছিল। কিন-ু ঐ ছাত্রীর ফোন পেয়ে ঘটনাস'লে উপসি'ত হয়ে আমি অভিভাবকদের বিয়ে বন্ধ করতে বলি। এতে মেয়ের বাবা-মা আমার উপর রেগে গিয়ে বলেন, ‘ভোট দিয়ে তোমাকে পাস করালাম কেন? আমাদের কাজে বাধা দেবে বলে?’ আমি শুধু বললাম, ‘মেয়ের বয়স কম। সুতরাং এ বিয়ে হবে না।’ শেষ পর্যন- ঐ বিয়ে হয় নি।   

আলেয়া বেগম জনপ্রতিনিধি হিসেবে অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রতিনিয়ত তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করেন। এলাকায় তাঁর অনেক সুনাম। তিনি বললেন, ‘আমি যদি জনপ্রতিনিধি নাও থাকি, তবু আমার কোন দুঃখ নেই। কেননা ব্র্যাকের মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কর্মসূচির সঙ্গে কাজ করার সুবাদে আমি সারাজীবন মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের পাশে থাকব।’ সবশেষে বললেন, ‘নিজের ঘর থেকেই মেয়েদের স্বাধীনতার শুরু হতে হবে। ঘরের সঙ্গেসঙ্গে বাইরের স্বাধীনতাও পেতে হবে। স্বাধীনতা পেলে তবেই মেয়েদের জীবনে পরিবর্তন আসবে।’ 


আমাদের কর্মস্থল

                

ব্র্যাক কুইজ

কোনটি দারিদ্র্য দূরীকরনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী?

বিকল্প যোগাযোগ পন্থা