ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রম অবলোকন

গত বছরের জুনে গিয়েছিলাম পাবনায়। উদ্দেশ্য ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রম দেখব। ২০ জুন সকাল ৯টায় পাবনা ব্র্যাক লার্নিং সেন্টার (বিএলসি) থেকে মোটরসাইকেলে রওনা হলাম। সঙ্গে ব্র্যাকের শিক্ষা বিভাগের পাবনা সদর উপজেলার দুজন ম্যানেজার। মো. রফিক দেখেন ব্র্যাক প্রি-প্রাইমারি স্কুল (বিপিপিএস), আর শাহ আলম দেখেন ব্র্যাক প্রাইমারি স্কুল (বিপিএস)। ব্র্যাকে তখন আমি নতুন, পাবনাতেও আমি নতুন। কিন্তু নতুন হওয়ার যন্ত্রণা ব্র্যাকে তুলনামূলকভাবে কম। পাবনাতেও সে যন্ত্রণা ছিল না বললেই চলে।

পাবনা থেকে ঈশ্বরদীর বড় রাস্তা ধরে মোটরসাইকেল একসময় গিয়ে চলতে শুরু করল ডান দিকের এক কাঁচা রাস্তা ধরে। দুই-তিন কিলো চলার পর থামল এক সময়। মোটরসাইকেল রেখে দু-তিনটি কাঁচাবাড়ি পেরিয়ে দাঁড়ালাম একটি টিনের ঘরের দরজায়। ঘন্টাখানেক পর যখন সে দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে মোটরসাইকেলে উঠলাম, মনটা কেমন স্মৃতিভারে কাতর লাগছিল। ভার কাটতে কাটতেই পৌঁছালাম আরেকটি ব্র্যাক স্কুলে, একটিমাত্র শ্রেণি সেখানে। একটিমাত্র কক্ষেই শিক্ষালয়টি। শিক্ষার্থীরা একটি করে বছর পার করবে আর নতুন ক্লাসে উঠবে। উঠতে উঠতে ক্লাস ফাইভ শেষ করে চলে যাবে। সে স্কুল দেখা শেষ করে যখন মোটরসাইকেলে নতুন প্রোগ্রামের উদ্দেশ্যে ছুটছি, মনে মনে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম প্রাইমারি স্কুলে পড়াকালে শৈশবের দিনগুলোতে। ভাবছিলাম গরিব মানুষদের জন্য এমন স্কুল করা যায়! শিক্ষাদানের ব্যাপারে শিক্ষক এমন উদ্দীপিত থাকতে পারেন!

২০১২ সালের ৩ জুন ব্র্যাকের লার্নিং ডিভিশন (বিএলডি)-এ যোগ দিয়েছি সিনিয়র সম্পাদক হিসেবে। সহকর্মীদের আন্তরিকতার ছোঁয়া পেতে পেতেই নির্দেশ হলো মাসের দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ সপ্তাহে যথাক্রমে উত্তরা, পাবনা এবং ময়মনসিংহে থাকতে হবে। উদ্দেশ্য বিএলডি এবং ব্র্যাকের কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। উত্তরা থাকতে বিএলসি-র নিজস্ব কার্যক্রমের বাইরে বিশেষ কিছু দেখা হয় নি। পাবনাতে গিয়ে সে দেখা যেন শেষ হতে চায় না। প্রতিদিন দুটি-তিনটি প্রোগ্রাম দেখছি আর বিস্ময়ের ভার বাড়ছে। সে বিস্ময় বিমূঢ়তায় পরিণত হলো যখন শিশুশ্রেণির ঐ শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলাম।

মাঝারি আকৃতির একটি সাধারণ ঘর। চারটি ছোট ছোট দলে বৃত্তাকার আকারে বসে আছে শিশুরা। যে দিকটায় দরজা সে পাশে ব্ল্যাকবোর্ড, আর কাছেই শিক্ষিকা। সালওয়ার-কামিজ পরা এক তরুণী। রফিকভাই এবং আলমভাইকে নিয়ে ঢুকলাম সে ঘরটিতে। যারা ব্র্যাকের চর্চার সঙ্গে পরিচিত নন তাদের জন্য বলে রাখা দরকার ব্র্যাকে সকল কর্মীকে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম নয়, ‘ভাই’ বা ‘দাদা’ এবং ‘আপা’ সম্বোধন করা হয়। আমরা গিয়ে দাঁড়াতেই ডান পাশের দলটির একটি ছেলে নিজের দলের পরিচয় দিল এবং তার ডান পাশের দলকে আহবান করল তাদের দলের পরিচয় দিতে। পর্যায়ক্রমে চারটি দল তাদের নিজেদের দলগত পরিচয় দিল। খেয়াল করলাম, তাদের পরিচয়দানের মধ্যে রয়েছে শিক্ষণের উপাদান। পরিচয়দানের আড়ালে তারা আসলে জানিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় ফল, ফুল, পাখি ইত্যাদি সম্পর্কে। কিন্তু আমার ঘোর আর কাটছিল না। চার-পাঁচ বছরের এক-একটি শিশু অচেনা মানুষদের সামনে কী চমৎকার সপ্রতিভতায় কথা বলছে। সুন্দর উচ্চারণে নিজেদেরকে উপস্থাপন করছে।

মাটিতে মাদুর পাতা। তাতে সুন্দর নকশা। এক একটা দল মাদুরের চার কোনার চারটি গোল বৃত্তকে কেন্দ্র করে বসে। বৃত্তগুলোর উপর সাজানো তাদের বই, স্লেট, স্কেল, মাঝের ছোট বৃত্তে গোল করে সাজানো কলম রাখার দানি। টিনের বেড়াতে ঝোলানো আছে শিক্ষা-উপকরণ। ঘর সজ্জার এসব উপকরণ খেয়াল করতে করতেই হঠাৎ দেখলাম, শিক্ষিকা বোর্ডে আগে থেকে আঁকা চারটি প্রতীকের একটির ওপর হাত রাখলেন এবং শিক্ষার্থীরা মুহূর্তেই ইংরেজি ‘ইউ’ বর্ণের আকৃতিতে বসে পড়ল। সন্দেহ নেই ছেলেমেয়েদের এই ক্ষিপ্রতা আমাকে মুগ্ধ করে ফেলে। শিক্ষিকা বললেন যে, আমাদের ঢাকা অফিস থেকে একজন অতিথি এসেছেন তাকে আমরা আমাদের পরিচয় দেব। ঘোষণা হতেই ডান পাশে বসা শিশুটি তার পরিচয় শুরু করল। ‘আমার নাম.... তোমার নাম কী?’ বলে সে তার ডানের জনকে ইঙ্গিত করল। অদ্ভুত এক খেলা খেলা ভাব। নিজেকে প্রকাশ করতে পারার অদ্ভুত এক কায়দায় দক্ষ তারা। পরিচয়পর্ব ঘুরতে ঘুরতে এক সময় আমার কাছে আসে। নাম বলার পর শিক্ষিকা সবার উদ্দেশে বলেন, যে অতিথির কাছে কারও কিছু জানবার আছে কি না। হাত তুলে অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন আসতে থাকে আমার দিকে, ‘কোথায় থাকেন’, ‘কজন ছেলেমেয়ে’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

এরপর যখন ট্রেন ট্রেন খেলা শুরু হলো বার বার মনে হচ্ছিল শিক্ষাদানের এমন একটি আনন্দময় পরিবেশের কথাই কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভেবেছিলেন। শিশুর মননকে লালনের এমন ভাবনা ব্র্যাক পেল কোথা থেকে! কোন্ উদ্দীপনা ব্র্যাকের নীতিনির্ধারকদের এমন একটি পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রণোদনা যোগায়! আমি যখন বিস্ময়ের ঘোর পার করছি, শুরু হয়ে গেল ট্রেন। হাতে লাল আর সবুজ পতাকা নিয়ে প্রস্তুত। বাঁশি বাজতেই বলতে শুরু করলো ট্রেন। খানিক পর বাঁশির সঙ্গে লাল পতাকা উঁচু হলো। শিক্ষিকা মুখে উচ্চারণ করলেন ‘নখপুর স্টেশন’। সকল শিক্ষার্থী তাদের দুই হাত প্রসারিত করে নখ দেখানোর ব্যবস্থা করলো। শিক্ষিকা প্রত্যেকের নখ পরীক্ষা করলেন, পরিষ্কার আছে কি না এবং কাটা হয়েছে কি না। যত সময় যেতে লাগল, আমার অভিভূত হওয়ার পালা বাড়তে লাগলো। এরপর ট্রেন দাঁতপুর স্টেশন, চুলপুর স্টেশন, পোশাকপুর স্টেশনে থামল।

আমাদের সময়ের স্বল্পতা ছিল। ব্র্যাকের অন্য স্কুল প্রোগ্রাম দেখতে যেতে হবে। সে কথা জানালাম শিক্ষিকাকে। তিনি ক্লাসকে জানালেন যে অতিথির সময় কম, তাই খেলা বাদ দিয়ে একটি দেশপ্রেমমূলক গান গাওয়া যায় কি না। সবাই সমস্বরে নাচের তালে তালে সুর করে গাইল দেশপ্রেমের একটি গান। শিক্ষিকা নিজেও নৃত্যে অংশ নিলেন। ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। শিক্ষিকার সঙ্গে কথা বললাম খানিকক্ষণ। জানলাম তার নাম রিমা খাতুন। দরিদ্র বাবা-মা পাঁচ সন্তানের একজন রিমা। এগারো বছর ধরে স্কুলটিতে শিক্ষকতা করছেন। ‘কেমন লাগে ব্র্যাক স্কুলে পড়াতে’ প্রশ্নের উত্তর সাধারণ সে-নারী রিমার মুখে যে ঔজ্জ্বল্য উদ্ভাসিত হয়েছে তা স্মৃতিতে উজ্জ্বল। বারবার প্রশ্ন জেগেছে সম্মানী তেমন উল্লেখযোগ্য নয়, তবু এত ঔজ্জ্বল্যের অধিকারী রিমা হলেন কীভাবে! এসএসসি পাস সাধারণ সে-মেয়ে রিমা বললেন, তাঁর খুব গর্ব তিনি ব্র্যাক স্কুলের শিক্ষক। বাচ্চাদের অভিভাবকেরাও তাকে একই রকম সম্মান দিয়ে থাকেন।

স্কুলে যাওয়ার এবং ফেরার পথে রফিকভাই এবং আলমভাইকে অনেক প্রশ্ন করেছি। কীভাবে স্কুলঘরটি হলো, স্কুল পরিচালনার কমিটি কীভাবে গঠিত হয় ইত্যাদি সব প্রশ্নের উত্তরে বুঝেছি, ব্র্যাক তাদের স্কুল চালাতে এমন একটি কৌশল অবলম্বন করেছে যাতে করে নিকটবর্তী বাড়ির মানুষজন স্কুলটিকে তাদের সম্পত্তি জ্ঞান করেন, সমাজের সকল মানুষ স্কুলটি পরিচালনায় অংশীদার হন। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার উদ্যোগটি যে জনমনে বিপুল উদ্দীপনা জাগায় তা তো সকলেরই জানা। আর সে সম্পৃক্ততার ফলেই তো ক্রমে ক্রমে শিক্ষাঙ্গনটি এলাকার মানুষের সম্পত্তি হয়ে যায়। তারা এর ভালোমন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন আত্মিকভাবে।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে মোটরসাইকেল গিয়ে পৌঁছল মজিদপুর গ্রামে। ঢুকে গেলাম একদম কাছাকাছি লাগানো ঘরের একটি পাড়াতে। একটা ঘরের বাইরে কমবেশি দেড় ফুট বাই দুই ফুটের একটি সাইনবোর্ড দেখে বুঝলাম এটাই স্কুল। টিনের ঘরটির দরজার বাইরে উঠোনে অনেকগুলো স্যান্ডেল সুন্দর করে বৃত্তাকারে সাজানো। আস্তে করে ঢুকলাম সে পাঠদানকক্ষে।

আয়তাকার সে ঘরটিতেও রয়েছে মাদুর পাতা। চারপাশ জুড়ে আসন। সকলের সামনে সাজানো শিক্ষা-উপকরণ। যতক্ষণ থেকেছি সবকিছুতেই মুগ্ধ হয়েছি। ঘরসজ্জা, শিক্ষণপরিবেশ সবকিছু মিলে যেন এক প্রীতিময় অঙ্গন। বিলাসিতার প্রশ্ন নেই, কিন্তুশ প্রয়োজন মিটেছে পুরোটাই। যেমন শিশুরা সেখানে তার বয়স ও শ্রেণিউপযোগী পাঠ্যবিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছে, তেমনি একই সঙ্গে দক্ষতা অর্জন করছে নিজেদেরকে উপস্থাপন করার ব্যাপারে। তারা নতুন মানুষের সামনে কথা বলছে, দল বেঁধে নির্দেশিতভাবে নাচগান করছে, শিখছে দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলোও।

সহযাত্রী দুই ম্যানেজারভাইকে প্রশ্ন করে জানলাম, এমন একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার নেপথ্যকথা। স্কুলটিতে বর্তমানে শিক্ষার্থীরা প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। স্কুলটি তৈরির আগে ব্র্যাকের শিক্ষা বিভাগের উপজেলা অফিস থেকে সার্ভে করা হয়, কোথায় স্কুল দরকার। নিকট অঞ্চলে সরকারি প্রাইমারি স্কুল না থাকার কারণেই প্রয়োজনটি অনুভূত হয়। শিশুরা ঐ স্কুলে একের পর এক শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে হতে ক্লাস ফাইভ পাস করে তারপর সরকারি স্কুলে গিয়ে ভর্তি হয়। হয়তো ইতোমধ্যে কাছাকাছি অন্য কোনো জায়গায় নতুন একটি স্কুল চালু হয়ে যায়। কথা বললাম শিক্ষিকা জাকিয়াতুলআপার সঙ্গে।

ব্র্যাকের স্কুল দেখতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, সেই তরুণ কাল থেকে আমি নিজেও তো স্বপ্ন দেখেছি বাংলাদেশের অধিকাংশ দরিদ্র মানুষের কাছে তাদের অধিকারগুলোর নিশ্চিত করার কথা ভাবতে, স্বপ্ন দেখেছি দরিদ্র পল্লির শিশুদের জন্য শিক্ষাকে সুনিশ্চিত করতে। নিজের চোখে দেখলাম ব্র্যাকের উদ্যোগে ব্যাপক পরিসরে সে কাজটি বিপুল উদ্যমে এগিয়ে চলেছে। ইচ্ছে হয়েছে বলি, ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রমকে কি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সুনামগঞ্জ থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত প্রসারিত করা যায় না! তাহলে তো ৫৪.১ শতাংশ সাক্ষরতার (আদমশুমারি ও গৃহগণনা ২০১১। সূত্র প্রথম আলো, ১৭ জুলাই ২০১২) এ দেশটিতে ৪৫ শতাংশের বেশি নিরক্ষরতার অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হয় না।

লেখক: সুব্রত কুমার দাস, সিনিয়র এডিটর, ব্র্যাক লার্নিং ডিভিশন, ঢাকা
 


আমাদের কর্মস্থল

                

ব্র্যাক কুইজ

কোনটি দারিদ্র্য দূরীকরনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী?

বিকল্প যোগাযোগ পন্থা