আন্তর্জাতিক মানব পাচার বিরোধী দিবস উপলক্ষে ব্র্যাক ও আইওএম -এর যৌথ সংলাপ

মানবপাচার রোধে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে এই সংক্রান্ত যেসব মামলা রয়েছে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। এছাড়া মধ্যসত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম কমিয়ে আনতে সমন্বিত উপায় খুঁজে করতে হবে। এতে নিরাপদ অভিবাসন সহজতর এবং মানবপাচার অনেকটাই কমে আসবে।

আজ রোববার (২৯ জুলাই, ২০১৮) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক এসব কথা বলেন। ৩০ শে জুলাই আন্তর্জাতিক মানব পাচার বিরোধী দিবস উপলক্ষে মানব পাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন পরিস্থিতি নিয়ে এই সংলাপের আয়োজন করা হয়। ইউরোপিয় ইউনিয়নের অর্থায়নে চলমান প্রত্যাশা প্রকল্পের আওতায় ব্র্যাক ও জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সংলাপে অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচার বন্ধ করতে হলে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাসহ সবাইকে একযোগে কাজ করার তাগিদ দেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন ব্র্যাকের স্ট্র্যাটেজি কমিউনিকেশনস অ্যান্ড এম্পাওয়ারমেন্ট কর্মসূচির উর্ধ্বতন পরিচালক আসিফ সালেহ। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক ও আইসিটি) মোহাম্মদ শামসুর রহমান। এছাড়া আইওএম বাংলাদেশের প্রধান গিওরগি গিগাউরি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের চার্জ দ্যা এ্যাফেয়ার্স ,মেরিও রনকোনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খাস্তগীর, সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মো. শাহ আলম বক্তব্য রাখেন। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান।

কাজী রিয়াজুল হক বলেন, মানবপাচারের সবচেয়ে বড় কারণ অজ্ঞতা। অজ্ঞতার কারণেই বিদেশগামী কর্মীরা দালালের খপ্পড়ে পড়েন। নিজের অধিকার সম্পর্ক সচেতন নয় বেশীরভাগ কর্মী। মানবপাচারের ঘঠনায় গত পাঁচ বছরে চার হাজরের বেশি মামলা হলেও অধিকাংশেরই বিচার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ২০১২ সালে মানব পাচার প্রতিরোধে ‘চমৎকার’ আইন হয়েছে। কিন্তু এ আইনের বাস্তব প্রয়োগ আমরা কতটা করতে পেরেছি তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ অধিকাংশর মামলারই বিচার হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের মূল সমস্যা বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অপরাধীদের শাস্তি কম হওয়ায় মানবপাচারের মতো বড় অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। তাই এ সংক্রান্তমামলাগুলো ‘দ্রুত নিষ্পত্তি’ না করলে অপরাধ আরও বাড়তে থাকবে।

তিনি বলেন, তবে এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেই মূল দায়িত্ব নিতে হবে। পুলিশকে সঠিক সময়ে অভিযোগপত্র জমা দিতে হবে। পাশাপাশি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম এর বাংলাদেশে প্রধান গিওরগি গিগাউরি বলেন, বিদেশ ফেরত অভিবাসীদের পুনরেকত্রীরণে সহায়তার প্রদানের উদ্দেশ্য হলো সরকারের উন্নয়নে সহায়তা করা। এজন্য সরকার, দাতা সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থোগুলো সমন্বিতভাবে মানবপাচার রোধে কাজ করতে হবে।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পলিটিক্যাল ও আইসিটি) শামসুর রহমান বলেন, মানবপাচার প্রতিরোধ বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে।

তিনি বলেন, তথ্য গোপন করার কারণে আমরা চাইলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারি না। কারণ সঠিকভাবে না গিয়ে অসংখ্য অভিবাসন কর্মী ‘দালাল বা বিভিন্ন উপায়ে’ বিদেশে পাড়ি জমান।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের চার্জ দ্যা এ্যাফেয়ার্স মেরিও রনকোনি বলেন, মানবপাচার প্রতিরোধ করতে হলে সারাদেশে সবাইকে সচেতন ও একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইউরোপ শাখার মহাপরিচালক খোরশেদ খাস্তগির বলেন, ইউরোপ থেকে অনিয়মত হয়ে পড়া বাংলাদেশিদের ফেরাতে সরকার এসওপি স্বাক্ষর করেছে। জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শ (ডিআইজি) শাহ আলম, বলেন মানব পাচারকারীদের হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

অভিবাসীদের মর্যাদা রক্ষায় সবাইকে একযোগে কাজ করার আহবান জানিয়ে ব্র্যাকের জ্যেষ্ঠ পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, প্রতি বছর আমাদের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হবে। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণে এই সংক্রান্ত সঠিক তথ্যভান্ডার, আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম ও বিদেশ যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ব্র্যাক এই কাজগুলো করার চেষ্টা করবে বলেও জানান তিনি।

মানবপাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন শীর্ষক মূল প্রবন্ধে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ থেকে মানবপাচারের ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। ২০১২ সালে মানব পাচার আইন হওয়ার পর থেকে এখন পযন্ত চার হাজার ১৫২টি মামলা হলেও শাস্তির ঘটনা খুবই নগন্য।

তিনি ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সূত্র উল্লেখ করে বলেন, এসব মামলার অধিকাংশরই বিচার না হওয়া ও পাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ায় গতবারের মতো এ বছরও যুক্তরাষ্ট্রের মানব পাচার প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে টায়ার-২ ওয়াচ লিস্ট রাখা হয়েছে।

সভায় মানব পাচার রোধে যেসব সুপারিশসমূহ উঠে আসে সেগুলোর মধ্যে উলে¬খযোগ্য হচ্ছে: মানব পাচার রোধে যে আইন আছে সেটির সঠিক বাস্তবায়স, মানব পাচারের মূল হোতাদের খুঁজে বের করা ও তাদের শাস্তির আওতায় আনা, অভিবাসন খরচ কমিয়ে আনা, আইন শৃংখলা বাহিনীর জবাবদিহিতা আনয়ন, সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা, মামলা হলে সেটির সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সমূহের সমন্বয় সাধন, সঠিকভাবে পুলিশ প্রতিবেদন তুলে ধরা।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাট-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন। ইউরোপ থেকে অনিয়মিত হয়ে ফেরত আসা বাংলাদেশিদের সহায়তা দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে আইওএম এবং ব্র্যাক যৌথভাবে ‘প্রত্যাশা ’নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ণ করছে।

অনুষ্ঠানে ইউরোপ ফেরত কয়েকজন সমুদপ্রথে তাদের অভিজ্ঞতা ও ইউরোপে যাওয়ার পথে পথে নানা ধরণের নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। এতে আরও বক্তব্য রাখেন আইওএমর এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক শ্যারণ ডিমানসে, উন্নয়ন কর্মী আসিফ মুনীর, হাসান ইমাম, সাংবাদিকদের সংগঠন আরবিএম এর সভাপতি ফিরোজ মান্না, ডেইলি স্টারের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক পরিমল পালমা প্রমুখ।

আমাদের কর্মস্থল

                

ব্র্যাক কুইজ

কোনটি দারিদ্র্য দূরীকরনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী?

বিকল্প যোগাযোগ পন্থা