ব্র্যাকের যুব জরিপ শিক্ষিতদের অধিকাংশই চান সরকারি চাকরি স্বল্পশিক্ষিতদের বিদেশমুখী প্রবণতা বেশি

বাংলাদেশের শিক্ষিত যুবদের বেশিরভাগই (৫৭% নারী এবং ৪২%) সরকারি চাকরি চান। ধনী ও শিক্ষিতদের অনেকেই চান মানসম্পন্ন শিক্ষা এবং তাদের নিজস্ব ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা লাভ করতে। অপরদিকে শিক্ষাবঞ্চিত বা স্বল্পশিক্ষিত অতিদরিদ্র আর নিম্ববিত্তরা জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমাতে চান। এদের আরো দুটি প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে শিশুদের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা এবং সম্পদের মালিক হওয়া। যুবসমাজের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ বিশ্বাস করেন যে তাদের শিক্ষা চাকরি পেতে সহায়তা করবে।

সম্প্রতি ব্র্যাক, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথভাবে পরিচালিত জাতীয়ভাবে প্রতিনিধিত্বমূলক একটি যুব-জরিপ থেকে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বুধবার (২৪ জুলাই ২০১৯) ঢাকার লেকশোর হোটেলে জরিপের প্রকাশনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জনাব জাহিদ আহসান রাসেল, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. জাফর উদ্দিন, ব্র্যাকের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ এবং বিআইজিডি-এর নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন।

ব্র্যাক যুব জরিপ ২০১৮ শীর্ষক এই জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ হচ্ছে যুব। দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর (১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী) সংখ্যা কর্মসক্ষমতাহীন ব্যক্তির (১৫ বছরের নিচে এবং ৬০ বছরের উপরে) সংখ্যার চেয়ে বেশি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সমৃদ্ধ করতে এই যুবরা মূল চালিকাশক্তি হতে পারে। এই পরিপ্রেক্ষিতে যুবদের দৃষ্টিভঙ্গি জানতেই এই যুব-জরিপ পরিচালনা করা হয়।

জরিপে পুরো দেশকে পাঁচটি অঞ্চলে ভাগ করে প্রতিটি অঞ্চল থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৩০টি উপজেলা/থানা নির্বাচন করা হয়। সেখান থেকে দুটি ইউনিয়ন/ওয়ার্ড নিয়ে আবার একটি করে গ্রাম/মহল্লা নির্বাচন করা হয়। তারপর আবার দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয় ১৪ জনকে (সাতজন পুরুষ, সাতজন নারী)। এভাবে ১৫-৩৫ বছর বয়সী মোট ৪,২০০ জনের অভিমত সংগ্রহ করা হয়েছে।

এই জরিপে প্রথমত যুবদের আত্মপরিচয় ও তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয়। এরপর নজর দেওয়া হয় তাদের শিক্ষা ও দক্ষতার নিরিখে উপার্জনমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি ও পছন্দের বিষয়ে।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭% পুরুষ এবং ৪% নারী ছিলেন উচ্চশিক্ষিত, বৃত্তিমূলক শিক্ষা ছিল ১৪%-এর। ইংরেজি ভাষা এবং কম্পিউটার দক্ষতা বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী পাওয়া গেছে মাত্র ১৬%। নারী ও স্বল্পশিক্ষিতদের মধ্যে এই সংখ্যা আরও কম। ৪০%-এর ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও, শহরের তুলনায় গ্রামে এ সুযোগ অনেক কম।

শিক্ষিত যুবদের মধ্যে ৫৭% নারী এবং ৪২% পুরুষ সরকারি চাকরি করতে চান। এইচএসসি অথবা এর নীচে শিক্ষাগত যোগ্যতার পুরুষদের মধ্যে প্রায় ৯০% উপার্জনমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত। যাদের লেখাপড়া যত বেশি, তারা উপার্জনমূলক কাজের সঙ্গে বেশি দেরিতে যুক্ত হন। নারীদের ক্ষেত্রে পঞ্চম শ্রেণি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষিতদের মাত্র ৫% উপর্জনমূলক কাজে যুক্ত। যারা লেখাপড়া করে না, উপার্জনমূলক কাজে যুক্ত নেই, এমনকি কোনো প্রশিক্ষণও (এনইইটি) গ্রহণ করছেন না, এদের প্রায় ৯০ ভাগই নারী। প্রায় ২০% অংশগ্রহণকারী বিদেশে কাজ করতে আগ্রহী হলেও তাদের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এ ব্যাপারে সক্রিয়ভাবে পরিকল্পনা করছে।

পছন্দের স্বাধীনতা অনুযায়ী, পুরুষ যুবরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বন্ধু ও পেশা নির্বাাচন, স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও এবং অর্থ ব্যয়ে অধিক স্বাধীনতা উপভোগ করছে। নারীরা বলছেন এই সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতার অভাব রয়েছে। মাত্র ৪০% নারী স্বাধীনভাবে চলাচলের সুযোগ পায়, যা পুরুষের অর্ধেক। তবে সবাই প্রধানত দুটি বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন: লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা (যেমন বাল্যবিয়ে, যৌতুক, যৌন হয়রানি এবং ধর্ষণ) এবং মাদক সম্পর্কিত সমস্যা।

যুব জরিপ ২০১৮-কে স্বাগত জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, ‌এ ধরনের কাজ আমাদের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করবে, কর্মক্ষেত্র চিহ্নিত করতে সহায়ক হবে। তবে সমস্যাগুলো ক্রমান্বয়ে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি আমরা। কর্মক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বাড়ছে, প্রাথমিক শিক্ষক পদে ৬০%-এর উপরে নারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। যুবসমাজের উন্নয়নে দেশের বিভিন্ন স্থানে যুব গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যুবকদের সমস্যা, সম্ভাবনা ও চাহিদা নিরূপন করে এসব কেন্দ্র থেকে সহায়তা দেওয়া হবে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. জাফর উদ্দিন বলেন, ‌এই জরিপে উঠে আসা কিছু বিষয়কে আপাতদৃষ্টিতে সমস্যা মনে হতে পারে। কিন্তু আমি বলব, এগুলো সমস্যা নয়, চ্যালেঞ্জ। আমরা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ চেষ্টায় এই সমস্যাগুলো মোকাবেলা করে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাব।

ব্র্যাকের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ বলেন, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে ব্র্যাক অনেক দিন ধরেই কাজ করছে। আমরা স্কুলভিত্তিক কর্মসূচি চালু করতে যাচ্ছি, যাতে এখানকার শিক্ষা পরববর্তীতে তাদের দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হয়।

ব্র্যাকের যুব জরিপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন

আমাদের কর্মস্থল

                

ব্র্যাক কুইজ

কোনটি দারিদ্র্য দূরীকরনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী?

বিকল্প যোগাযোগ পন্থা